ঢাকাঃ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের হলরুমের একটি কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে গৃহবধূকে গণধর্ষণের মূল পরিকল্পনাকারী মামুনুর রশিদ ওরফে মামুন (৪৪) এবং তার অন্যতম সহায়তাকারী মুরাদকে (২২) গ্রেফতারের পর বেরিয়ে এসেছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। বুধবার রাতে রাজধানীর ফার্মগেট এলাকা থেকে তাদের গ্রেফতার করে র্যাব।
র্যাব জানায়, মামুন একজন মাদক কারবারি। মাদক বেচাকেনার সূত্রে তিনি জাবি ক্যাম্পাসে যাতায়াত করতেন। সেখানকার মাদক গ্রহণকারী অনেক সিনিয়র ছাত্রের সঙ্গে তার সখ্য গড়ে ওঠে। সেই সূত্রে তিনি ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে মাদকসহ রাতযাপন করতেন। ছাত্রদের নিয়ে বসাতেন মাদকের আসর।
অন্যদিকে গ্রেফতার মুরাদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে মাস্টার্সের শিক্ষার্থী। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলে থাকতেন। তার বিরুদ্ধে নওগাঁ থানায় মারামারিসংক্রান্তে একটি জিডি রয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ানবাজার মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন।
মামুন ভুক্তভোগীর স্বামীর পূর্ব পরিচিত
র্যাবের মিডিয়া বিভাগের পরিচালক মঈন জানান, গ্রেফতার মামুন ছয় থেকে সাত বছর ধরে মাদক কারবারের সঙ্গে জড়িত। কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে প্রতি মাসে কয়েক দফায় সাত থেকে আট হাজার ইয়াবা সংগ্রহ করতেন। পরে তা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের এলাকাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কিছু মাদকসেবী শিক্ষার্থীকে সরবরাহ করতেন। মামুন ছিলেন ভুক্তভোগী নারীর স্বামীর পূর্ব পরিচিত। ভুক্তভোগী নারীর বাসায় তিন থেকে চার মাস সাবলেটে ভাড়াও ছিলেন তিনি।
পরিচয়ের সুবাদে ভুক্তভোগীর স্বামীকে দিয়ে মামুন জাবিতে মাদক সরবরাহ করতেন। পরে কোনো একদিন তিনি তাকে জানান, তার থাকার সমস্যা হচ্ছে। এজন্য তিনি সেই নারীর বাসায় সাবলেটে কয়েক মাস ভাড়াও থাকেন।
সেদিন যা ঘটেছিল
র্যাব কর্মকর্তা জানান, ঘটনার দিন মামুন সেই নারীর স্বামীকে জাবির মীর মোশাররফ হলের এ ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষে ডেকে নেন। সেখানে কয়েকজন বড় ভাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবেন বলে তাকে ডেকে আনেন। হলে থাকা মোস্তাফিজ, মুরাদ, সাব্বির, সাগর সিদ্দিক ও হাসানুজ্জামানের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন মামুন। নিজের কাপড়-চোপড় ভুক্তভোগীর বাসায় রেখে এসেছেন জানিয়ে ওই নারীকে তা নিয়ে আসতে বলেন। কথামতো সেই নারী রাত ৯টার দিকে মীর মোশাররফ হলের সামনে গিয়ে উপস্থিত হন।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। ছবি: সংগৃহীত
এসময় মামুন ও মোস্তাফিজের নির্দেশে মুরাদ ভুক্তভোগীর স্বামীকে ৩১৭ নম্বর রুম থেকে হলের রুমে নিয়ে যান। এই সুযোগে মামুন ও মোস্তাফিজ সেই নারীকে নির্জন স্থানে নিয়ে পর্যায়ক্রমে ধর্ষণ করেন। পরে তারা তাকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বাসায় চলে যেতে বলেন। ভুক্তভোগীর স্বামী রাতে বাসায় ফিরলে সেই ঘটনা জানতে পারেন।
ধর্ষণের ঘটনা ছড়িয়ে পড়লে মামুন ও মোস্তাফিজ গা ঢাকা দেন। অন্যদিকে মুরাদ ঢাকা ছেড়ে নওগাঁর পত্নীতলায় চলে যান।
গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে মাদক কারবারে মামুন
গ্রেফতার মামুন প্রায় ২০ বছর আগে ঢাকার জুরাইন এলাকায় আসেন এবং গার্মেন্টস কর্মী হিসেবে চাকরি নেন। পরে তিনি আশুলিয়া এলাকায় যান। সেখানে গার্মেন্টসের চাকরির পাশাপাশি মাদক কারবারের সাথে জড়িয়ে পড়েন। বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকাসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের কিছু মাদকসেবী শিক্ষার্থীকে মাদক সরবরাহ করার ফলে তাদের সাথে সখ্য তৈরি হয়। গার্মেন্টসের চাকরি ছেড়ে দিয়ে ২০১৭
সাল থেকে পুরোপুরি মাদক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন মামুন।
তার বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় আটটি মাদক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় তিনি একাধিক বার কারাভোগ করেছেন।
গত ৩ ফেব্রুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের মীর মশাররফ হোসেন হলের এ ব্লকের ৩১৭ নম্বর কক্ষে স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনায় চারজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এ ঘটনায় ভুক্তভোগীর স্বামী বাদী হয়ে ঢাকার আশুলিয়া থানায় একটি গণধর্ষণ মামলা করেন। সেই মামলায় মামুন ও মুরাদকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বলে জানায় র্যাব।